ওয়েব ডেস্ক: দেশীয় এয়ারলাইনগুলোকে শক্তিশালী না করে শুধু বড় বিমানবন্দর নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। একইসঙ্গে তিনি দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর পরিচালন ব্যয় কমানো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি এবং বিমান চলাচল খাতে নীতিগত সংস্কারের আহ্বানও জানিয়েছেন।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘শুধু এভিয়েশন হাব’ বললেই এভিয়েশন হাব হওয়া যায় না। দেশীয় এয়ারলাইনগুলোকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিদেশি এয়ারলাইন এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করবে না। দেশীয় এয়ারলাইনকে সক্ষম করে তুলতে হবে এবং তাদের ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করতে হবে।
তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের প্রসঙ্গ তুলে ইউএস-বাংলার এমডি বলেন, টার্মিনাল নির্মাণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এয়ারলাইন অপারেটরদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ করা হয়নি। অথচ তৃতীয় টার্মিনাল মূলত অপারেটর ও যাত্রীদের প্রয়োজন বিবেচনা করেই তৈরি হওয়ার কথা। আমি নিজে পাশাপাশি অন্য এয়ারলাইন অপারেটরদেরও তৃতীয় টার্মিনালে কী ধরনের সুবিধা প্রয়োজন, সে বিষয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ হয়নি।
এভিয়েশন হাব হিসেবে সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ এলাকা প্রায় ১০০ বিঘা। সেখানে যাত্রীদের দুই থেকে ছয় ঘণ্টা সময় কাটানোর মতো পর্যাপ্ত কেনাকাটা, বিনোদন ও অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে শুধু বড় টার্মিনাল নির্মাণ করে এভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
এভিয়েশন খাতের নীতিগত সংস্কারের প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ১৯৮৪ সালের বিধিমালার পরিবর্তে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি কার্যকর হলে এভিয়েশন খাতে বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করি। আন্তর্জাতিক মান ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
ইউএস-বাংলা বাংলাদেশে একমাত্র আইএটিএ সদস্য এয়ারলাইন উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন নীতিমালার ফলে এয়ারলাইনগুলোর বড় ধরনের ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে। একটি বোয়িং উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের দাম প্রায় ৯ মিলিয়ন ডলার এবং নতুন ইঞ্জিনের দাম প্রায় ২৩ মিলিয়ন ডলার। ড্রিমলাইনারের একটি ইঞ্জিনের দাম ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ইঞ্জিন বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে বর্তমান প্রক্রিয়ায় সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। নতুন নীতির ফলে এ ধরনের ব্যয় কমবে।
বিমানবন্দরে রানওয়ের সংকটের কারণে এয়ারলাইনগুলোর অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের বিষয়টিও তুলে ধরেন ইউএস-বাংলার এমডি। তিনি বলেন, একটি বোয়িং উড়োজাহাজ রানওয়ের জন্য অপেক্ষা করার কারণে প্রায় ৩০০ কেজি অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়ায়। এয়ারবাসের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ প্রায় ৯০০ কেজি। ছোট উড়োজাহাজের ক্ষেত্রেও ২৫ মিনিটের ফ্লাইটের সমপরিমাণ প্রায় ৭৫ কেজি জ্বালানি খরচ হয়।
ইউএস-বাংলার ক্ষেত্রে শুধু একটি রানওয়ের কারণে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, অবতরণের সময় উড়োজাহাজকে তিনটি এবং উড্ডয়নের সময়ও তিনটি করে অপেক্ষমাণ সারিতে থাকতে হয়। একটি রানওয়ের কারণে এই দীর্ঘ অপেক্ষা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের পাশাপাশি ফ্লাইট সময়মতো পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা চালুর দাবি জানিয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাংলাদেশে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত। ঢাকা-কলকাতা রুটে চারটি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানি কাজ করছে। কুয়ালালামপুরেও একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাকে সুরক্ষার যুক্তিতে প্রতিযোগিতা সীমিত রাখা হয়েছে। এতে সেবা ও আকাশপথে যোগাযোগ দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে বিমানভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ার পেছনে সরকারি কর ও শুল্ককে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর যেতে একজন যাত্রীর কাছ থেকে সরকারি কর ও ভ্যাট বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা নেওয়া হয়। বিপরীতে কুয়ালালামপুর থেকে বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে এ ধরনের খরচ প্রায় ২০০ টাকা।
ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার সময় সরকারি কর ও শুল্ক বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা দিতে হয়। বিপরীতে সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে আসার সময় এ খাতে খরচ প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা। দুবাইসহ অন্যান্য গন্তব্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে কর ও শুল্কের বড় পার্থক্য রয়েছে বলেও দাবি করেন।
অভ্যন্তরীণ রুটের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে যশোর যেতে বিভিন্ন কর ও চার্জ মিলিয়ে একজন যাত্রীর ওপর প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় পড়ে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের এয়ারলাইনগুলোর জন্য উড়োজাহাজের জ্বালানির দামও তুলনামূলক বেশি বলে দাবি করেন তিনি। টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ কমিশন দেওয়ার বিষয়টিও এয়ারলাইনগুলোর ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ব্যয়ের তুলনা তুলে ধরে ইউএস-বাংলার এমডি বলেন, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর গেলে একটি বোয়িং উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রায় ৯৭ হাজার টাকা খরচ হয়। অন্যদিকে কুয়ালালামপুর থেকে কোনো এয়ারলাইন বাংলাদেশে এলে স্থানীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়। ২০২৩ সালে ইউএস-বাংলা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সনদ পেয়েছে। বিধি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা রাখে এবং আন্তর্জাতিক মানের সনদও রয়েছে। তবে লাইসেন্স না থাকায় তারা এখনো এ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে না।
পর্যটন ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিমান পরিবহনের ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পর্যটনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও বিমান পরিবহনের বিভিন্ন চার্জ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশে এক কেজি কচু ১৫ থেকে ২০ টাকা দিয়ে কেনা গেলেও তা বিদেশে রপ্তানির সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন চার্জ দিতে হয়।
বিমান কেনার পরিবর্তে লিজিং ব্যবস্থার বিষয়টি তুলে ধরে ইউএস-বাংলার এমডি বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ এয়ারলাইন লিজিং কোম্পানির কাছ থেকে উড়োজাহাজ নেয়। বড় অঙ্কের উড়োজাহাজের অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রেও এসব প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক অর্থায়নের বড় অংশ বহন করে। ইউএস-বাংলা আগামী কয়েক বছরের জন্য প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের উড়োজাহাজের অর্ডার দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এই অর্থ ইউএস-বাংলার নিজস্ব নয়। উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী ও লিজিং কোম্পানির অর্থায়নে উড়োজাহাজ নিয়ে ভাড়ার ভিত্তিতে পরিচালনা করা হবে।
সম্মেলনে বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক।
সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন।
অনুষ্ঠানে এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার অংশীজনেরা অংশ নেন। সম্মেলনে গোল্ড স্পন্সর ছিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।