মাদারীপুর প্রতিনিধি : মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ এলো, জরিপ হলো, ম্যাজিস্ট্রেট এলো—কিন্তু উচ্ছেদ হলো না; হাজারো মানুষের দুর্ভোগের মুখে কেন নিষ্ক্রিয় ঠুঁটো জগন্নাথ প্রশাসন? জবাবদিহি চাইছেন এলাকাবাসী
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা, একাধিক সরকারি জরিপ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লিখিত আবেদন এবং দুই দফায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের পরও মাদারীপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কুকরাইল এলাকার প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো সরকারি রাস্তা দখলমুক্ত না হওয়ায় জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক এতগুলো পদক্ষেপের পরও উচ্ছেদ অভিযান বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ কী—তা জানতে চেয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে জরিপ ও পরিমাপ সম্পন্ন হয়েছে। উচ্ছেদ কার্যক্রমের জন্য লিখিত অনুরোধও জানানো হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট অবৈধ স্থাপনা সাত দিনের মধ্যে স্বউদ্যোগে সরিয়ে নিতে দখলদারকে নোটিশ দেন। উচ্ছেদ অভিযান নির্বিঘ্ন করতে রাস্তার পাশে থাকা ফলজ গাছ সরানোর মৌখিক নির্দেশনা পেয়ে এলাকাবাসী নিজেদের গাছ কেটে ফেললেও অভিযান বাস্তবায়িত হয়নি। এতে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। তাঁদের প্রশ্ন, প্রস্তুতি ও নির্দেশনার পরও সরকারি রাস্তা দখলমুক্ত করতে বাধা কোথায়?
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পরও জবাবদিহি কোথায়?
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-৩ শাখার স্মারক নং ০৫.০০.০০০০.১৮২.২৭.০০০২.২৫-৩২১, তারিখ ১৯ জুলাই ২০২৬-এর মাধ্যমে সরকারি আদেশ বাস্তবায়নে গড়িমসি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে জেলা প্রশাসক, মাদারীপুরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এলাকাবাসীর দাবি, সামগ্রিক অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তির পরিবর্তে জেলা প্রশাসনের বিচার শাখা ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সাত কর্মদিবসের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন চায়। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং উচ্ছেদ অভিযানের পরবর্তী সময়সীমা কী, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
কারণ দর্শানোর পত্রের তারিখ ও নতুন জরিপ নিয়ে প্রশ্ন
জেলা প্রশাসনের প্রতিষ্ঠা শাখার দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর পত্রের স্মারক নং ০৫.৪১.৫৪০০.১০৭.০৩.০০১.২৪-৭২১-এ প্রদর্শিত তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬। তবে এলাকাবাসী হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পত্রটির প্রকৃত প্রস্তুত, স্বাক্ষর ও জারির সময় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের সন্দেহ, সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর ২৮ সেপ্টেম্বর বদলি বা অবমুক্তির সময়ের কাছাকাছি পত্রটি জারি হয়ে থাকতে পারে। একই তারিখে বিচার শাখার পত্রে অগ্রগতি প্রতিবেদন-সংক্রান্ত চিঠির অনুলিপি দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠা শাখার কারণ দর্শানোর পত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অনুলিপি দেওয়া হয়নি বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন।
পূর্ববর্তী সরকারি জরিপ ও প্রতিবেদন থাকার পর নতুন করে উচ্ছেদ নথি সৃজনের আড়ালে মাপজোক বা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়ে থাকলে তার অনুমোদন ও আইনগত ভিত্তি নিয়েও এলাকাবাসীর আপত্তি রয়েছে। উপযুক্ত কম্পিটেন্ট অথরিটি দ্বারা পূর্ববর্তী প্রতিবেদন বাতিল বা সংশোধনের লিখিত আদেশ এবং নতুন প্রতিবেদন তৈরির অনুমোদন যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করতে হবে।
বদলির পর বিকল্প ব্যবস্থা এবং সরকারি স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ কোথায়?
দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর বদলি বা অবমুক্তির পর উচ্ছেদ কার্যক্রম সচল রাখতে বিকল্প কর্মকর্তা নিয়োগ, দায়িত্ব পুনর্বণ্টন কিংবা প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার নথিভিত্তিক জবাব চান এলাকাবাসী। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি মামলায় সরকারি স্বার্থ রক্ষায় জেলা প্রশাসনের আইনগত পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, বারবার লিখিতভাবে অবহিত ও তাগাদা দেওয়ার পরও কার্যকর উদ্যোগ না পাওয়ায় এক প্রকার বাধ্য হয়ে এলাকাবাসী কেই আদালতে যেতে হয়েছে; পরে পৌর কর্তৃপক্ষও আপত্তি দাখিল করেছে। এলাকাবাসীর দাবি, বর্তমানে সরকারী গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আদালতের কোনো কার্যকর স্থিতাবস্থা আদেশ বা উচ্ছেদে বাধাদানকারী নিষেধাজ্ঞা নাই। ফলে প্রশ্ন, যদি আইনগত ভাবে কোনো বাঁধা বহাল না থাকে, তবে সরকারি রাস্তা দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে এখন আইনগত বা প্রশাসনিক বাধা কোথায়? আর সরকারি স্বার্থ রক্ষায় পূর্ববর্তী নিষ্ক্রিয়তার কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে তদন্ত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনার কি উদ্যোগ সরকার গ্রহন করেন সেটায় দেখার অপেক্ষায়?
সরকার কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়:
মাদারীপুরের সরকারি রাস্তার অবৈধ দখল উচ্ছেদে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক সরকারি আদেশ বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকের ধারাবাহিক নিষ্ক্রিয়তা, দায়িত্বে অবহেলা, তদারকির দায় এড়ানোর সম্ভাব্য প্রচেষ্টা, মন্ত্রণালয়কে অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানের আশঙ্কা, দাপ্তরিক পত্রের তারিখসংক্রান্ত গুরুতর অনিয়ম এবং সম্ভাব্য দুর্নীতি ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগে স্বাধীন তদন্তপূর্বক আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান বাস্তবায়নে কার্যত দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়ে গত ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ পুনরায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তরে অভিযোগ দাখিল করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
এখন প্রশ্ন—এতগুলো অভিযোগ, সরকারি নথি ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর সরকার কী পদক্ষেপ নেবে? অভিযোগ গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে? দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে? নাকি সরকারি রাস্তা দখলমুক্ত করার বিষয়টি ফাইলেই আটকে থাকবে? কোনো কার্যকর আইনগত বাধা না থাকলে অবিলম্বে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সরকারি রাস্তা দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপই বলে দেবে, সরকারি আদেশ বাস্তবায়ন ও জনস্বার্থ রক্ষায় প্রশাসনিক জবাবদিহি কতটা কার্যকর।