শনিবার বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি এবং পর্তুগালে ছড়িয়ে পড়া এই অসন্তোষের ঢেউ পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জুড়েই সরকারগুলোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।
ফ্রান্স
ফ্রান্স কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম উত্তাল প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ এই বিক্ষোভে যোগ দেন এবং বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
কয়েক সপ্তাহের টানা ছাত্র আন্দোলনের পর শুরু হওয়া এই পদযাত্রাগুলো পরবর্তীতে সহিংসতায় রূপ নেয়। উগ্রপন্থী ও বিচ্ছিন্ন কিছু গোষ্ঠী সরকারি ভবন, বিলাসবহুল শোরুম এবং সুপারমার্কেটকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর পাশাপাশি পুলিশের যানবাহন ও সদস্যদের ওপর হামলা চালালে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানান, ১ হাজার ২০০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। মধ্য প্যারিসে মোতায়েন করা পুলিশ সদস্যদের পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি ও আহতের সংখ্যা আরও বেশি না হওয়াটা অলৌকিক ঘটনা।’
ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়েছে।
প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রাগোয়ার বলেন, ‘রাজধানীর পুরো রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত করা হয়েছে’।
লিমোজ নগরীতে মুখমণ্ডলে মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরেরও বেশি পুরনো সিটি হল বা নগর ভবনটি বড় ধরনের ধ্বংসের মুখে পড়ে। একই সময়ে মার্সেই ও লিলের সিটি হলে হামলা চালানো হয় এবং ভাঙচুর চালানো হয়। অন্যদিকে লিয়োঁয় বিক্ষোভকারীরা শহরের পর্যটন কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় বলেন, এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ‘আইনি মামলা পরিচালনা করা হবে এবং উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে’।
বেলজিয়াম
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে (যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে ছাত্ররা ইতোমধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ করে আসছিল)—পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
পুলিশের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা তাদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও ককটেল ছুড়ে মেরেছে এবং আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
ব্রাসেলসের পূর্বাঞ্চলীয় ছোট শহর লিয়েজেও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। তবে এতে কতজন অংশ নিয়েছিলেন, তা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।
পর্তুগাল
এদিকে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসন সংকট বা ঘর না পাওয়ার প্রতিবাদে আনুমানিক কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। ২০১৭ সাল থেকে পর্তুগালে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, আর নতুন ভাড়ার চুক্তিপত্রের ক্ষেত্রে বাড়িভাড়াও বেড়েছে প্রায় সমপরিমাণে।
পর্তুগালের সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম শুক্রবার বলেন, ‘সরকার রাজপথের চিৎকারের কাছে নতিস্বীকার করবে না।’ এর জবাবে বিক্ষোভকারীরা জানান, তাদের নেতারা বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে ‘সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও অবিবেচক’।
ইতালি
ইতালির মিলানে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, দোকানে দোকানে লুটপাট চালায় এবং শহরের কেন্দ্রে বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে পিয়াজ্জা দেল দুওমো চত্বর এবং একটি বিলাসবহুল বিপণি বিতান পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায়।
যুদ্ধ এবং জীবনযাত্রার উর্ধ্বমুখী খরচের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই পদযাত্রাটি প্রথমে শান্তিপূর্ণ থাকলেও, পরবর্তীতে মুখ ঢাকা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের ওপর পাথর, ফুটপাতের ব্লক ও নানা বস্তু ছুড়ে মারে এবং রেস্তোরাঁর টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডে আগুন লাগিয়ে দেয়।
জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
ইতালির বার্তা সংস্থা ‘লাপ্রেসে’-র প্রতিবেদনে জানানো হয়, এ ঘটনায় অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানান।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, ‘বিক্ষোভ প্রকাশ করা একটি অধিকার। কিন্তু আমাদের শহরগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া কোনো অধিকার হতে পারে না।’ একই সাথে তিনি এই ঘটনার জন্য “বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিক্ষোভকে ব্যবহার করা সন্ত্রাসীদের” দায়ী করেন।
মিলানের মধ্য-বামপন্থী মেয়র সালা বলেন, ‘বিক্ষোভের পেছনের কারণগুলো বোধগম্য। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা এবং শহরের মারাত্মক ক্ষতিসাধন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
বোলোনিয়া শহরেও পুলিশ জানিয়েছে যে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারে এবং সংঘর্ষে জড়ায়।
ফ্রান্সের বিক্ষোভের ছড়িয়ে পড়া এইচইসি প্যারিস বিজনেস স্কুলের ইইউ আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমানো আল জাজিরাকে জানান, অন্যান্য দেশের বিক্ষোভ ফ্রান্সের মতো বিশাল আকার ধারণ না করলেও, এগুলো অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত হতে পারে। আলেমানো বলেন, ‘ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু… এবং এখন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে এটি ফ্রান্সের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, এই দেশগুলোতে শনিবারের বিক্ষোভই শেষ নাও হতে পারে এবং সামনে নতুন নতুন বিক্ষোভের কেন্দ্র বা হটস্পট তৈরি হতে পারে। গ্রিস, জার্মানি এবং অস্ট্রিয়ায় এই আন্দোলনের ‘প্রাথমিক লক্ষণ’গুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে এবং ‘আগামী সপ্তাহে’ সেখানে ব্যাপক গণসংহতি ও বিক্ষোভের আশা করা হচ্ছে, বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, এগুলো কোনো একক আন্দোলন নয়, বরং একই সময়ে সংঘটিত বেশ কয়েকটি পৃথক বিক্ষোভ, যার পেছনে কিছু ‘যৌথ বা একই ধরনের অসন্তোষ’ রয়েছে। যেমন—শিক্ষাক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়ালেখা শেষে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
আলেমানো জানান, ইউরোপের জন্য অত্যন্ত সংকটময় একটি সময়ে এই অশান্তির সূচনা হলো। কারণ আগামী ১২ মাসের মধ্যে স্পেইন, ফ্রান্স, ইতালি এবং পোল্যান্ডে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে ইউরোপ এক ‘নজিরবিহীন জাতীয় নির্বাচনের মহাসূচির (সুপার-সাইকেল)’ প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আলেমানো বলেন, ‘অনিবার্যভাবেই, এই সব বিক্ষোভ এবং গণসংহতিগুলো আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনার মূল কেন্দ্রে চলে আসতে যাচ্ছে।’
আলবেনিয়া
শনিবার টানা পঞ্চম দিনের মতো আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানার কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গা পুলিশের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়।
মুখোশধারী বিক্ষোভকারী(যাদের বেশিরভাগই স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী) শিক্ষামন্ত্রণালয় রক্ষা করার দায়িত্বে থাকা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করে।
এর জবাবে পুলিশ জলকামান ও পর্যায়ক্রমে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে, ফলে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো রাবার বুলেট ব্যবহারেরও খবর পাওয়া গেছে।
তরুণ ও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, শিক্ষাক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং রাজনৈতিক শ্রেণির দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই আন্দোলনের সূচনা। ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সমাজতান্ত্রিক দলের প্রধানমন্ত্রী এডি রামা এবং বিদ্যমান দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক কাঠামোর পতনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলন শুরু করে।
আন্দোলনকারীদের মতে, টানা ১৩৫ দিন শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদের পর কোনো ফল না পাওয়ায় জুনের শুরু থেকে আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। সরকারি ভবন, ব্যাংক ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। শতাধিক পুলিশ ও আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন, ৫০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৮০ জনের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এডি রামা তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং পদত্যাগ করতে রাজি হননি। তিনি এই আন্দোলনের পেছনে বিরোধী দল এবং ইইউ-তে আলবেনিয়ার যোগদানে বাধাদানকারী ‘বিদেশী শক্তির ষড়যন্ত্র’ রয়েছে বলে দাবি করেন।

















